পলাতক - ওমর ফারুক

বিশ্রী গন্ধের একটা ঢেকুর বের হলো । শাক খেলে, বিশেষ করে রসুন বাড়িয়ে রান্না করা মুলা শাক খেলে এমন ঢেকুর আমার বেশি হয়।

অনেকক্ষন ধরে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।একটা সময় চট্টগ্রাম-বসুরহাট লাইনের একটা বাস পেলে উঠে পড়ি । পুরো বাস যেন মানুষের বিশাল ভ্রাম্যমাণ হাট। অনেক কষ্টে কোন রকম বাদুড়-ঝুলা ঝুলে যাওয়ার সুযোগ পেলাম। কিছুদূর যাওয়ার পরই বিশ্রী ঢেকুরটা উঠল। রাস্তাঘাটে হাঁচি, কাশি, বমি, ঢেকুর সবই অসহ্য লাগে। তারপরও মাঝেমাঝে অসহ্য ব্যাপারগুলো সহ্য করতে হয়। আজকে অবশ্যই মন ভাল, জিইসিতে মোনা অপেক্ষা করবে বলবে। দীর্ঘ একযুগ পর আমাদের দেখা হবে। গাড়ির জন্য অপেক্ষা, বাদুড়ঝুলে যাওয়া, বিশ্রী ঢেকুর সবই সাময়িকভাবে বিরক্তির উদ্রেক করলেও মোনা মেয়েটার কথা ভেবে অদ্ভুত ভাল লাগা কাজ করছে।

আচ্ছা, মোনা কি আমাকে পছন্দ করবে? কেনই বা পছন্দ করবে? চৈত্র মাসের কাঠফাটা রোদে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ছাতার মত গায়ের রং, কোটরগত চোখ, ক্রমশ কমে যাওয়া চুল, প্রমাণ সাইজের চেয়ে তিন ইঞ্চি কম হাইট, সাথে কিছুক্ষণ পর পর জমে যাওয়া কফের কাশি। সারাক্ষণ হীনমন্যতা আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।

আমার কাশি নিয়ে বন্ধুরা তো প্রায় হাসাহাসি করে। একজন বলে, যক্ষা হয়েছে তোর এবার আর রক্ষা নাই। আরেকজন বলে, তোর দাদার জেয়াফতের আগে তোর জেয়াফত খাবো।বন্ধুরাও হারামি। মানুষের কষ্ট নিয়ে মজা করতে ছাড়ে না। কোথায় একটু সাহস দিবে? না, তা করবে না। উল্টো দুর্বল দিক বলে বলে প্রতিনিয়ত গ্রিল বানাবে। আচ্ছা, দুর্বল দিকগুলো নিয়ে আমার কি করার আছে? অভ্যাসের জন্য মানুষ দায়ী হতে পারে, শারীরিক গঠনের জন্য তো না।

অবশ্যই মোনাকে বলেছি আমার বর্তমান হাইটের কথা, গায়ের রঙের কথা। কাশির কথা অবশ্যই বলি নাই। সাতাশ -আটাশ বছর বয়সে কেউ এভাবে কাশবে, সেটা কি বলা যায়। লজ্জার ব্যাপার না?

-তোমাকে দিয়ে আমি মগডাল থেকে আম পাড়াব নাকি? হাইটের কথা বলায় রেগে বলেছিল বলেছিল মোনা।

কালো ছেলেই আমার পছন্দ আর তুমি যা আছ তাই। ব্যাস, এসব নিয়ে আর কথা বাড়াবে না।

আহা, মেয়েটি এত ভাল কেন? এসব ভাবতে ভাবতে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠি।

নয়দুয়ারি বাজারে দুটা সিট খালি হলে, একটিতে বসে যাই। কখন যে বাস এতদুর আসল, টেরই পাইনি। নতুন করে দেখা করার জন্য চাপাচাপি অবশ্যই মোনা ই করছে। মোবাইলে কথা হচ্ছে, এই তো বেশ। দেখা করার কি দরকার? তাছাড়া আমার বর্তমান অবস্থা দেখার পরে মোনার যদি পছন্দ না হয়, তখন তো হারাতে হবে। জীবনের প্রথম চাকরির ভাইভায় যে ভীতি কাজ করেছিল, সকাল থেকে সেই ভয় কাজ করছে। দীর্ঘদিন পরে দেখা বলেই হয়ত। আধো ভয় আধো উত্তেজনা। যতই মোনা অভয় দিক না কেন, ভয় তো লাগছেই।

জানুয়ারির কোন একদিন হবে হয়ত, গোলাপি রঙের সোয়েটার পরা একটা মেয়েকে সেভেনের ক্লাসরুমে আবিস্কার করি। সদ্য দু-একটা গোঁফের উঁকিঝুঁকি দেওয়া সব বন্ধুদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে মেয়েটি। ক্লাস ক্যাপ্টেন হওয়ায়, অবধারিত ভাবে ছেলেদের মধ্যে সবার আগে আমার সাথে কথা বলে।

তুমিই সফিকুল, তুমিই তাহলে ক্লাস ক্যাপ্টেন। আমি মোনা। আমার বাবা ব্রাকের অফিসার।আমাকে পাঠ ধরিয়ে দিবে। বুঝতেই পারছ, আমি এখানে নতুন এসেছি।

মোনার কথা বলা আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম। ধীরে ধীরে মোনার সাথে আমার বন্ধুত্ব বাড়ে, আর বন্ধুদের সাথে দুরত্ব বাড়ে। তার বাসায় নতুন কিছু বানালে আমার জন্য নিয়ে আসত। একদিন ছোট ছোট রসগোল্লা এনে আমাকে খেতে দেয়। সেই রসগোল্লার গালভরা প্রশংসা করলে মোনা শাসনের সুরে বলে,

গাধা, এগুলো রসগোল্লা না, কুমিল্লার রসমালাই।বাবা সকালে এনেছে।

বন্ধুরা আমাদের দুজনকে নিয়ে নানা গাল-গল্প বানাতে শুরু করে। আমরা এসবে পাত্তা দিতাম না।

গতবছর জেলা মিটিংয়ে গেলে স্কুল বান্ধবী চামেলির সাথে দেখা। তার কাছ থেকে মোনার খবর পাই আর ফোন নাম্বারটা চেয়ে নিই।মোনাকে আচানক যেভাবে ক্লাস সেভেনে আবিস্কার করি, তেমনি ক্লাস এইটে উঠে দেখি মোনা নাই। সেই থেকে গোলাপি সোয়েটার পরা কাউকে দেখলে মোনা ভেবে ভুল করতাম।কতবার যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছি! চামেলির কাছ থেকে নাম্বার নেওয়ার পরও অনেকদিন কল দেই নাই। অনেক দিনের যোগাযোগহীতায় জড়তা ভর করে।

-হ্যালো, কতটুকু আসছ?

-সিটি গেইট পার হইছি।

-গুড, আমি জিইসি কনভেনশনের সামনে আছি।চিনবে তো আমাকে?

-ঠিক বুঝতেছি না। অনেক দিনের পরে দেখা তো?

-সমস্যা নাই, হলুদ জামা পরে আছি। মাথায় হিজাব। প্রয়োজনে জিইসিতে নেমেই কল দিও।

-আচ্ছা।

জিইসিতে নেমেই ডাচ-বাংলার এটিএম বুথের সামনে চলে যাই। ওপারে মোনা গাড়িতে হেলান দিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একলা। এই কবছরে শারীরিক ভাবে আমি যত পিছিয়েছি, মোনা তত এগিয়েছে। সমুদ্র সৈকতে সন্ধ্যা নামার সময়, হুট করে সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে, যেভাবে একটা ঘি রঙের আভা আকাশ থেকে খসে খসে পড়ে, মোনার রূপ যেন সেভাবে খসে খসে পড়ছিল।

মোনা একটানা কল করেই যাচ্ছিল আর আমি গাড়িতে আইয়ুব বাচ্চুর গান 'তোমার যোগ্য আমি নই, একারণে পালাতে চাই' শুনতে শুনতে নীড়ে ফিরছিলাম।
লেখক- সহকারী শিক্ষা অফিসার, লোহাগাড়া শিক্ষা অফিস।

No comments