লোহাগাড়ায় হেফজখানা ছাত্র খুনের ঘটনায় মামলা: প্রতিষ্ঠাতাকে জড়ানোয় প্রতিবাদ

হেফজখানা ও এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা গোলাম রসূল কমরী।

এম.আবদুল জব্বার ফিরোজ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম):
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় উত্তর কলাউজান শাহ্ আমজাদিয়া হেফজখানা ও নুরীয়া এতিমখানার ছাত্র খুনের ঘটনায় গত ১ সেপ্টেম্বর শনিবার মামলা রুজু করা হয়েছে। মামলার বাদী নিহত ছাত্রের পিতা উত্তর কলাউজান সিকদার পাড়ার মৃত গোলাম কাদেরের পুত্র মোঃ ইসহাক মিয়া (৩৯)। মামলায় আসামীরা হলো উত্তর কলাউজান পীর বাড়ির মাওলানা গোলাম রসুল কমরীর পুত্র মোঃ এহসান বিন কমরী (২৮), মোঃ মকসুদ বিন কমরী (২৫), মৃত মৌলানা নূর আহমদের পুত্র হেফজখানার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা গোলাম রসুল কমরী (৬৯) ও পশ্চিম কলাউজানের আবদুর রহিমের পুত্র হেফজখানার ছাত্র মোঃ সাজেদ কচির (১০)। বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন লোহাগাড়া থানার ওসি (তদন্ত) আবদুল জলিল।
মামলার ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা গোলাম রসুল কমরী জানান , প্রতিদিনের ন্যায় তিনি হেফজখানা ও এতিমখানার ছাত্রদের ফজরের নামাজ আদায় করার জন্য ঘুম থেকে ডেকে দেন। ঘটনার দিন সবাই ঘুম থেকে উঠলেও সাজ্জাদ কচির তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় বসে ছিল। এক পর্যায়ে সাজ্জাদ কচিরের মুখে ঘুমের ঘোর কাটাতে অপর ছাত্র মিজানুর রহমান পানি ছিটিয়ে দেয়। এতে কচির ক্ষিপ্ত হয়ে মিজানের মাথায় রড দিয়ে আঘাত করে। ফলে মিজানুর রহমান মারাত্মকভাবে আহত হলে স্থানীয় একটি বেসরকারী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ১১টায় সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
তিনি আরো জানান, রাত্রে জানাযা শেষে লাশ দাফনের পরে গত শনিবার আমি আমার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ,মেম্বার ও গণ্যমাণ্য ব্যাক্তির্বগরা শোকাহত পরিবারকে শান্তনা দেওয়ার মানষে বৈঠকে মিলিত হই। তিনি বৈঠকে এ অনাকাঙ্খতি বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আজ আমার প্রতিষ্ঠানে অনাকাঙ্খতিভাবে এক শিশু ছাত্রের হাতে অপর শিশু ছাত্র খুন হয়েছে। যেখানে আমার কোন যোগ সাজস বা সম্পৃক্ততা নাই। তবে এ ঘটনায় আমি তাৎক্ষণিকভাবে তাকে চিকিৎসার জন্য গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালে পাঠানোকে প্রধান্য দিয়েছি এবং পরে দুইজন ছাত্র মারফতে তার বাড়ীতে আব্বা-আম্মাকে খবর পাঠিয়েছি। যদি তাৎক্ষণিক তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে পরে তার মা বাবাকে খবর দেওয়াটা দুষের হয় তবে খুবই দুঃখিত, লজ্জিত ও মর্মাহত। শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, আজ আমার বাগানের একটি গোলাপ ফুল ঝরে গেল, আমি তার মা-বাবাকে ধৈর্য্য ও সহনশীল হওয়ার এবং আল্লাহর দরবারে শোক সংবরণ করার তৌফিক কামনা করছি।
নিহত ছাত্র মিজানুর রহমান।

কিন্তু একটি মহল এ ঘটনাকে ভিন্নহাতে প্রবাহিত করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। তারা নিহতের পিতাকে প্রভাবিত করে আমি ও আমার ২ সন্তানকেও আসামী করেছে, যা খুবই দুঃখজনক। নিজেকে নির্দোষ দাবী করে মাওলানা গোলাম রসুল কমরী আরোও বলেন, মূলতঃ তিনি ও তার সন্তানদের আসামী করে মামলা দিয়ে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ আমি উক্ত ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে আহত ছাত্রকে চিকিৎসা দিতে পাঠাই।  সাথেসাথে মা-বাবাকে খবর পাঠিয়েছি এবং তারা মোবাইলে আমার কাছে হাসপাতালের ঠিকানাও নিয়েছে, আমি তাদের কোন মিথ্যা তথ্য দিইনি।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাদীর পুত্র ওই হেফজখানায় হিফজুল কোরআন পড়াশুনা করত। ঘটনার দিন ৩০ আগষ্ট বৃহস্পতিবার সকালে প্রতিদিনের ন্যায় তার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম পুত্র মোঃ মিজানুর রহমানের জন্য নাস্তা নিয়ে যায়। বাদীর স্ত্রী ছেলেকে খোঁজ করে না পেয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতার কাছ থেকে জানতে চাইলে দোকানে নাস্তার জন্য গেছে বলে জানান। তখন বাদীর স্ত্রী হেফজখানার অন্য একজন ছাত্রের কাছে জানতে পারেন ভোরে তার ছেলেকে অপর ছাত্র মোঃ সাজেদ কচির লোহার রড দিয়ে আঘাত করে মাথা ফেটে দিয়েছে। তাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যায়। বাদীর স্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে বাড়িতে এসে বিষয়টি তাকে জানান। পরে বাদী ও তার স্ত্রী হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। এ সময় হেফজখানার প্রতিষ্ঠাতার কাছ থেকে ফোনে জানতে চাইলে তিনি জানান, তাদের ছেলে ডাক্তার দেখাতে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। পরবর্তীতে তারা ছেলেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫ম তলার ২৮ নং ওয়ার্ডে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়। ছেলের মাথার বাম পার্শ্বে রক্তাক্ত জখম এবং নাকে-মুখে রক্ত ও ফেনা বের হচ্ছিল। বাদী ও তার স্ত্রীর উপস্থিতি টের পেয়ে হেফজখানা প্রতিষ্ঠাতার দু’পুত্র হাসপাতালে থেকে পালিয়ে যায়। এ সময় তারা হেফজখানার কাজের বুয়াকে দেখতে পান। এছাড়াও হাসপাতালে ভর্তির সময় অভিযুক্তরা নিহত ছাত্রের পিতার নাম জসিম উদ্দিন লিবিপদ্ধ করেছে। যা সত্য গোপনে অপচেষ্টা করছিল।
অপরদিকে, নিহত হেফজখানার ছাত্র মোঃ মিজানুর রহমানের ময়নাতদন্ত শেষে ৩১ আগষ্ট রাতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত ছাত্রের পিতা ঘটনাটি সুষ্ঠ তদন্ত পূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ কামনা করেছেন।
এদিকে একজন প্রবীণ শ্রদ্ধাবাজন আলেমকে অন্যায়ভাবে হত্যা মামলার আসামী করায় এলাকায় জনসাধারণের মাঝে ও সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। সচেতনমহল মনে করেন হেফজখানায় অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছাত্রের অনাকাঙ্খিত একটি দুর্ঘটনায় একজন শিশু হাফেজের মৃত্যু এবং হেফজখানার প্রতিষ্ঠাতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ আলেমেদ্বীন মাওলানা গোলাম রসুল কমরী সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা দু'টিই বেদনাদায়ক।

No comments