“ছুরির একটি আঘাতে ছিন্ন হলো পঁয়ত্রিশ বছরের সংসার জীবন "- হাসানুজ্জামান মোল্যা


প্রিয়দেশ ডেক্সঃ
ঘরে থাকা একটি ফ্রুট কাটার নাইফ যে রহমান (৬০)-আয়েশার (৫০) পঁয়ত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটাবে, কে জানতো? পরিবার, প্রতিবেশী বা ঘাতক নিজেই কি জানতো? আসলে কেউই জানতো না। এমন কি ঘাতক বাদে ঘটনার পরেও কেউ জানতো না। ঘরের খবর পরে জানবেই বা কেমন করে। ঘরের শত্রু বিভীষণ।
মূল ঘটনার আগে একটু প্রাক-পরিচিতি তুলে ধরতে চাই। আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগে কোন এক শুভ ক্ষণে শুরু হয় রহমান-আয়েশা দম্পতির পথচলা।সোনার চামচ মূখে নিয়ে তাদের যাত্রা শুরু না হলেও গ্রামীণ জনপদে সুখে-শান্তিতেই চলছিল তাদের সংসার জীবন। একে একে ৬ সন্তানের জনক- জননী হন তারা।

৪ মেয়ের ২ জন বিবাহিত, ১ জন একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী এবং অন্যজন প্রতিবন্ধী। বড় ছেলে মাস্টার্স অধ্যয়নরত, ছোটজন পড়ছেন আলীম শ্রেণীতে । ছোটজন বাড়িতে থাকেন, পড়ালেখার পাশাপাশি পাশের বাজারে ছোট একটি দোকান চালান। স্ত্রী, ছোট ছেলে ও অবিবাহিত ২ কন্যা নিয়ে নিজ বাড়িতে বসবাস করতেন রহমান। সুখেদুঃখে সংসারকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসলেও শেষ জীবনে তার এই নির্মম পরিণতির আভাস কি রহমান পেয়েছিল? এর উত্তর আমাদের অজানা ই থেকে যাবে।
এবার মূল বিষয়ে আলোকপাত করি। গতকাল অর্থাৎ ০৯.০৭.২০১৮ তারিখে রাত ৯ ঘটিকার দিকে সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ ফোনে জানান সাতকানিয়া থানার চরতিতে ৬০ বছরের একজন লোক নিজ বাড়িতে মারা গেছেন, ঘটনাটা সন্দেহজনক। এস এই ফারুকসহ আমরা ঘটনাস্থলে যাচ্ছি। বিস্তারিত পড়ে জানাবো। ভিতরটা আতকে উঠল। ভিতরে ভিতরে নানা প্রশ্ন উকি মারছে। কি কারনে এই হত্যাকান্ড, কে তার খুনি, নাকি অন্যকিছু। পরবর্তীতে জানা গেল রহমানের তলপেটে একটি কোপের দাগ, গায়ে অন্যকোন আঘাতের চিহ্ন নেই। পরিবারের লোকজন জানাল তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। স্ত্রী জানালো তিনি তার মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের নিকট গেছিলেন, ছেলে বলল সে দোকানে ছিল, কেউ বলছে সে খুব রাগি মানুষ ছিল নিজে নিজেও কাজটি করতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। যা হোক, হত্যাকান্ড ধরেই আমাদের কার্যক্রম শুরু হল। একদিকে চলছে সুরতহাল, পোস্টমর্টেম করতে হাসপাতালে লাশ পাঠানোর কাজ, অন্যদিকে তদন্ত অর্থাৎ ক্লু বের করার কাজ। চারিদিকে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করেও তেমন কোন তথ্য পাওয়া গেল না, পরিবারের লোকজনও আগের জায়গায় অনড়। সুরতহাল শেষে গাড়িতে করে লাশ পাঠানো হলো পোস্টমর্টেম এর জন্য হাসপাতালে। রাত বাড়ছে, লোক কমছে। কিন্তু পুলিশের সরার কোন পথ নাই। হত্যার কারন, হত্যাকারীকে তো পুলিশকেই বের করতে হবে।
ব্যর্থ হলে, দিনশেষে সব দোষ নন্দঘোষের। একদিকে গলদঘর্ম অবস্থা, অন্যদিকে ফোনে বিভিন্ন সাংবাদিকের নানা প্রশ্ন। পরিশেষে প্রাপ্ত সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে সবাই এই সিদ্ধান্তে আসলাম যে এটা পারিবারিক হত্যাকান্ড। জনাব নুরেআলম মিনা বিপিএম, পিপিএম পুলিশ সুপার, চট্রগ্রাম মহোদয়কে সবকিছু অবহিত পূর্বক তার নির্দেশনা মোতাবেক রহমানের স্ত্রী,ছোট ছেলে ও মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হলো।
থানায় এনে তাদেরকে সারারাত আলাদা আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেও নতুন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। সারারাত সবার শ্রম যেন পন্ডশ্রম। সকালবেলা শুরু হলো পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ। এবার উপরওয়ালা সদয় হলো, পরাভূত হলো ইবলিশ। পারিবারিক কলহ ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ঘরে থাকা চাকু দিয়ে রহমানের তলপেটে আঘাতটি করেছে তার স্ত্রী আয়েশা হ্যা স্ত্রী আয়েশাই। এই একটি আঘাতেই নিভে যায় রহমানের জীবন প্রদীপ। আঘাতের পর ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আয়েশা চাকুটি পুতে রাখেন বাড়ির গোয়ালঘরের উত্তর পাশে, রক্তমাখা লুঙি - গেঞ্জিও লুকিয়ে রাখে সযতনে। তবে পরবর্তীতে নিজ হাতে বের করে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে তুলে দেন আমাদের হাতে, জব্দ করা হয় আলামত হিসেবে।
মামলার পরবর্তী কার্যক্রম চলমান।
ঘটনাস্থল : চরতি, সাতকানিয়া থানা, চট্টগ্রাম
তারিখ : ০৯.০৭.২০১৮
বি:দ্র: দম্পতির ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
---------------------------------------------------------------------
লেখক: হাসানুজ্জামান মোল্যা
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সাতকানিয়া সার্কেল।
---------------------------------------------------------------------
কৃতজ্ঞতা :
১) জনাব নুরেআলম মিনা বিপিএম,পিপিএম, পুলিশ সুপার, চট্টগ্রাম।
২) জুয়েল, এ এস পি ( প্রবেশনার)
৩) মোঃ রফিকুল হোসেন, ও সি, সাতকানিয়া থানা।
৪) মুহাম্মদ মুজিবর রহমান, পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত, সাতকানিয়া থানা।
৫) এস আই ওমর ফারুক ও সহযোগী অন্যান্য পুলিশ সদস্যবৃন্দ।

No comments