পতিত পুরুষ- ওমর ফারুক




বিড়াল পায়ে নিঃশব্দে এসে সাদেক অজগরের মত নাসিমাকে পেছন থেকে পেঁচিয়ে ধরে। আবুল বিড়ির ভটভট গন্ধ এবং নিশ্বাসের উঠানামায় নাসিমা বুঝতে পারে সাদেক এসেছে। ঘর থেকে ঘাটলাটা একটু দূরে। সন্ধ্যের সময়টায় ঘাটলায় কেউ থাকে না। অন্ধকার হওয়ায় দূর থেকে ঘাটলায় কি হচ্ছে তা খেয়াল করা যায় না। নাসিমা দুপুরের এঁটো থালা বাসন ধুতে এসেছে। সাদেকও প্রতিদিন কাতলামাছের মত নাক উঁচা কইরা কড়া নজর রাখে কখন নাসিমা ঘাটলায় আসে তা দেখার জন্য? জয়নব চাচী কোথায় আছে এবং মাহমুদ চাচা কখন গঞ্জে যায় কিংবা ঐ বাড়ির অন্যরা কি অবস্থায় আছে সবকিছুর খবরাখবর নিয়ে তারপর সে নাসিমার কাছে আসে। সাদেকের স্পর্শে নাসিমার শরীরে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে যায়। প্রতিবারই এমন হয়। এতে তার ডেকচি ঢলার তীব্রতা আরো বেড়ে যায়। প্রথম প্রথম হাত সরিয়ে দিলেও এখন দেয় না। সাদেককে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখা শুরুর পর থেকে  নাসিমা তাকে সরাতে পারে না। সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী মেয়েটাও একটা পুরুষের উপর নির্ভরতা খুঁজে, ভরসা পেতে চায়। নাসিমার মত একটা কচুরিপানা নির্ভরতা খুঁজবেই। সাদেকের আশ্বাস ও ভালবাসায় নাসিমার খুঁটির জোর বেড়ে যায়। সাদেক বলে উঠে,

 - নাসিমা, এইবার শহরে গেলে তোর জন্য বিদেশী স্নো- পাউডার নিয়ে আসবো। এসব মুখে মাখলে নাকি রাজরানীর মত লাগে?

- আমার অত রাজরানী হওয়ার খায়েশ নাই। মানুষের বাড়িতে বান্দির কাজ করি। রাজরানী হয়ে লাভ কি?

- এসব স্নো-পাউডার মাখলে তোরে যা লাগবে তুই চিন্তাও করতে পারবি না।

- অত চিন্তা করনের কাম নাই। দুবেলা পেট পুরে খেতে পারলে আর ইজ্জৎ ঢাকার জন্য দুই টুকরো কাপড় পেলে আমার হবে। বান্দি আবার রাজরানী হয়ে কি করবে?

সাদেক সুযোগ নেওয়ার জন্য যে এসব বলে নাসিমা বুঝতে পারে। ষোল-সতের বছরের জীবনে এই বাড়িতে থেকে কম লাথি কিল খায় নি সে? দুবেলা পেট ভরে ভাত খাওয়ার জন্য বাড়ির অন্দরের কাজ থেকে বন্দরের সব কাজ সে করে যাচ্ছে। প্রতিদিন মানুষের ছল দেখে কিভাবে চলতে হয় সে শিখে গেছে। বাড়ির বাড়তি কাজ করার জন্য জয়নব খালা  মাঝেমাঝে আদর করে তাকে মাথায় তুলে ফেলে। রাত বিরেতে খালা যখন বাতের ব্যথায় কাতরাতে থাকে তখন নাসিমাকে ডেকে বলে,

-মা, পা দুটো একটু টিপে দাও তো। বাতের ব্যথায় তো মইরা গেলাম গো। ও মা, একটু জোরে টিপে দাও। তুমি ছাড়া অন্য কেউ টিপলে এত ভাল লাগে না।

আবার সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হলে, নাস্তা দিতে একটু উনিশবিশ হলে সেই জয়নব খালা  চিৎকার করে ঘর তুলে ফেলে।

- নাসিমা মাগী, এতক্ষণ লাগে নাস্তা দিতে। নবাবজাদী হইছস নাকি? কি সুখে আছে দেখো তো সবাই? দিনের বারোটা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছে মাগীটা। তোর বাপের ঘর না এটা যে এখানে ইচ্ছেমত  ঘুমাবি।

সে বুঝে গেছে মানুষ স্বার্থের জন্য যেমন বুকে টেনে নেয়, আবার স্বার্থ ফুরালে পিঠের নিচে চাপাও দেয়। জয়নব খালার একই মুখে মা এবং মাগী দুই ডাকই শুনেছে সে। এখন সব বুঝে। কিন্তু প্রতিবাদ করার মাটি তার পায়ের নিচে নাই। সাদেকও হয়ত এমন হবে। মিথ্যা আশ্বাস জেনেও সাদেক এলে নাসিমা কেন জানি গলে যায় মোমের মত। কোন বাধা দিতে পারে না।

বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে নাসিমা দেখছে সে মাহমুদ ও জয়নব খালার বাড়িতে কাজ করছে। অনেক আগে একটা মহিলা মাঝেমাঝে আসত এই বাড়িতে। সবাই বলত, নাসিমার মা আসছে। তাকে মা বলে ডাকার জন্য নাসিমাকে বলত। ঐ মহিলাকে দেখলে নাসিমার রাগ উঠে যেত। কিসের মা? মা হলে তাকে তো এখান থেকে নিয়েই যেত। আশেপাশে তার বয়সীরা তাদের মাকে সবসময় কাছে পায়। মা বলে প্রতিদিন ডাকতে পারে। নাসিমার সেই সুযোগ নাই। মহিলাটাকে দেখলে মাহমুদ অনেক ক্ষেইপা যাইত, জয়নব খালাও। মাগী, ছিনাল বইলা চুল ধরে টেনে বের করে দিল তাকে । চলে যাওয়ার সময়ও পেছন ফিরে ফিরে নাসিমাকে একবার মা বলে ডাকার জন্য মিনতি করেছিল। পরে পরে ঐ মহিলা আসা বন্ধ করে দেয়। নাসিমার খুব ইচ্ছে করে কাউকে মা বলে ডাকতে। বাবা বলে ডাকতে। মহিলাটার জন্য নাসিমার খারাপ লাগে। অনেক খারাপ। ভাবলেই চোখ ভিজে যেত নাসিমার।

নাসিমা পাশের বাড়ির ভুলুর মার কাছে শুনেছে তার মা ও নাকি এই বাড়িতে কাজ করত। যখন যুবতী ছিল তখন মাহমুদের নজর পড়েছিল নাকি তার মায়ের উপর। একদিন  কুমারী অবস্থায় মা হলে, পাপের ফসল ঘরে আনছে বইলা তাকে মারধোর করে মাহমুইদ্দা ও জয়নব খালা। পরে ফসল রেখে পাপকে সবাই মিলে ঘরে থেকে বের করে দেয়। ভুলুর মা হেয়ালি করে গল্প বলে। তাই পুরো গল্প নাসিমার কখনো জানা হয় না। ভুলুর মায়ের কাছ থেকে তার জন্মের ঘটনা জানার পর থেকে মাহমুইদ্দার প্রতি তার ঘিন হয়, রাগ হয়। তার মা এবং মাহমুইদ্দা দুজন মিলে তারে জন্ম দিছে। তার জন্মের জন্য তার মাকে শেষ আশ্রয়টুকু ছেড়ে যেতে হয়েছিল। সবাই বলে তার মা পতিতা হয়ে গেছে।

নাসিমারও সাদেকের প্রতি অবিশ্বাস হয়। সেও যদি তার ভিতর কাউরে পয়দা কইরা তারে ছুড়ে ফেলে দেয় তাহলে সে কি করবে? তাকেও কি ঘর ছাড়তে হবে? নাসিমা এসব ভেবে সাদেক থেকে দূরে থাকতে চায়। কিন্তু যেই সাদেক এসে তাকে জড়িয়ে ধরে সব ভুলে যায় নাসিমা।

জয়নব খালা সবসময় তাকে পুরুষ থেকে দূরে থাকতে বলে। তিনি বলেন, পুরুষ মানুষ ভালবাসার কথা বলে সন্তান ফয়দা করে দিতে জানে। কিন্তু সন্তানের বাবা হতে চায় না। কিছু হলে অস্বীকার করে'। পুরুষ মানুষকে নাসিমা ঘৃণা করে। তার মায়ের সাথে প্রতারণা করা মাহমুইদ্দাকে অনেক বেশি ঘৃণা করে। সে ভেবেছিল পুরুষ থেকে দূরে থাকবে। চুম্বক থেকে লোহা যেমন পালাতে পারে না তেমনি সেও যে  সাদেকের কাছ থেকে পালাতে পারে না।

একদিন রান্নাঘরে তরকারি কাটার  সময় নাসিমা বমি করে। বমি করতে করতে সে অজ্ঞান হয়ে যায়। যখন জ্ঞান ফেরে জয়নব মাহমুইদ্দাকে ডেকে বলে, নাসিমাও তার মায়ের মত পাপের ফসল ঘরে নিয়ে আসছে। মাহমুইদ্দা জবাবে বলে, মাগীর মেয়ে মাগী হইছে। কার লগে শুইয়া পেট বাধাইছে খবর নাও ? আমার ঘরে এসব পাপ রাখবো না। আজকেই তারে বের করে দাও'।

দুদিন পর নাসিমা প্রচণ্ড দুর্বলতা নিয়ে অজ্ঞাত পানে পা বাড়ায়। পথে সাদেকের সাথে তার দেখা হলে বলে, সাবধানে যেও নাসিমা। এক দলা থুথু সাদেকের মুখে মেরে নাসিমা বলে, কুত্তার বাচ্চা তোদের মত পতিত পুরুষদের কারনেই আমরা আশ্রয়হীনরা শেষ আশ্রয়টুকুও হারাই, পতিতা হয়ে যাই।

লেখক:  ওমর ফারুক, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম

No comments