ক্রমবর্ধমান যৌন নিপীড়নঃ আইন ও আইনের কার্যকারিতা

ক্রমবর্ধমান যৌন নিপীড়নঃ আইন ও আইনের কার্যকারিতা।
              মুহাম্মদ ইয়াকুব


সমকালীন সবচেয়ে বেশি আলোচিত কিন্তু ঘৃণ্য শব্দের নাম ধর্ষণ। এই ঘৃণ্য শব্দটির প্রয়োগ সভ্যতার উৎকর্ষতা সাধনের সাথে সাথে বেড়ে চলছে। যেন সভ্যতা, আধুনিকতা, জাগরণের সাথে শব্দটি সম্পৃক্ত! যৌন নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে ষাট বছরের বৃদ্ধা, তরুণী গৃহবধূ, যুবতি নারী, কিশোরী এমনকি শিশু। বখাটে যুবকদের দ্বারা যেমন নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে ঠিক তেমন নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে নিকটাত্মীয় (অনেক সময় এমন নিকটতম যে প্রকাশ করতে লজ্জায়, ঘৃণায় কালি থেমে যায়!), প্রতিবেশী, শিক্ষক, মন্দিরের পুরোহিত, এমনকি মসজিদের ইমাম দ্বারা!

ধর্ষণ শব্দটির সাধারণ অর্থ যৌন নির্যাতন। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে ধর্ষণের সংজ্ঞা মোটামুটিভাবে এরকম,- নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ পূর্বক যৌন নির্যাতনই ধর্ষণ। ধর্ষণের স্বীকার হতে পারে কোন নারী বা পুরুষ! যদিও পুরষ ধর্ষণের হার খুবই কম, প্রায় শূন্যের কোটায়। আবার এমনও না যে পুরুষ ধর্ষণের স্বীকার হয় না! ২০১২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই নারী বা পুরুষ যে কেউই ধর্ষণের স্বীকার হতে পারে বলে তাদের সংজ্ঞায় উল্লেখ করেছে। এর পূর্বে তারা শুধুমাত্র "নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপূর্বক যৌনসঙ্গম"কে ধর্ষণ অবিহিত করতো আমেরিকার শক্তিশালী এই গোয়েন্দা সংস্থা।

বাংলাদেশের সংবিধানে দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় পাঁচটি বিষয়বস্তু নির্ধারণ পূর্বক ধর্ষণকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছেঃ
১। নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে।
২। নারীর সম্মতি ছাড়া।
৩। মৃত্যু বা জখমের ভয় দেখিয়ে।
৪। নারীর সম্মতি নিয়েই, কিন্তু পুরুষটি জানে যে সে ওই নারীর স্বামী নয় এবং পুরুষটি তাও জানে, নারীটি তাকে এমন একজন পুরুষ বলে ভুল করেছে যে পুরুষটির সঙ্গে তার আইনসঙ্গতভাবে বিয়ে হয়েছে বা বিবাহিত বলে সে বিশ্বাস করে।
৫। নারীর সম্মতিসহ কিংবা সম্মতি ছাড়া যদি সে নারীর বয়স ১৬ বছরের কম হয়। মানে ১৬ বছরের চেয়ে কম বয়সী মেয়ের সঙ্গে যে কোন অবস্থান হতে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ বলে গণ্য হবে।

মূলকথা হলো প্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারীর সাথে জোর পূর্বক অথবা ষোল বছরের কম বয়সী মেয়ের সাথে সম্মতিক্রমে বা জোর পূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণ বলা হয়েছে। আইনে পুরুষ ধর্ষণের বিষয়টি উল্লেখ নেই। বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে পুরুষ ধর্ষণের হার প্রায় শূন্যের কোটায়। তবু বিষয়টি আইনে অন্তর্ভূক্ত থাকা উচিত।

উইকিপিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী ধর্ষণ হলোঃ
Rape is a type of sexual assault usually involving sexual intercourse, which is initiated by one or more persons against another person without that person’s consent.

ইসলামের দৃষ্টিকোণ হতে ধর্ষণের সংজ্ঞা কিছুটা ভিন্ন। সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতীত বিবাহ বহির্ভূত যে কোন ধরণের যৌন সম্পর্কই ইসলামের দৃষ্টিকোণ হতে ধর্ষণ, যিনা, ব্যভিচার। বিয়ে করা স্ত্রী ছাড়া কারো সঙ্গে কোনোরূপ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাকে ইসলাম কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এটিকে মহাপাপ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই পবিত্র কোরআনের সুরা নেসায় যুদ্ধবন্দিনীকেও বিয়ে না করা পর্যন্ত তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়নি বরং কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, এই বন্দিনীদের স্ত্রীরূপে রাখার আগে স্বাধীন নারীদের ন্যায় বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে। পরস্পর সম্মতিতে বিবাহিত কোন নারী-পুরুষ বিবাহ বহির্ভূত যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হলে ইসলামি আইনে মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। অবিবাহিত হলে ১০০ বেত্রাঘাতের কথা বলা হয়েছে।
ধর্ষণের ক্ষেত্রে একপক্ষ হতে যিনা সংঘটিত হয়। আর অন্যপক্ষ (ধর্ষিতা) হয় মজলুম বা নির্যাতিত। তাই মজলুমের কোনো শাস্তি নেই। কেবল জালিম বা ধর্ষকের শাস্তি হবে।
ধর্ষণের ক্ষেত্রে দুটো অপরাধ সংঘটিত হয়ঃ
@ যিনা
@বলপ্রয়োগ/ ভীতি প্রদর্শন।
প্রথমটির জন্য পূর্বোক্ত যিনার শাস্তি পাবে। পরের অপরাধের জন্য ফকীহদের একটি অংশ বলেন, মুহারাবার শাস্তি হবে।
মুহারাবা হলো, পথে কিংবা অন্যত্র অস্ত্র দেখিয়ে বা অস্ত্র ছাড়াই ভীতি প্রদর্শন করে ডাকাতি করা। এতে কেবল সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া হতে পারে, আবার কেবল হত্যা করা হতে পারে। আবার দুটোই হতে পারে। নারীর সম্ভ্রম একজন নারীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
বিখ্যাত মালেকি ফকিহ ইবনুল আরাবি ধর্ষণের শাস্তিতে মুহারাবার শাস্তি প্রয়োগের মত ব্যক্ত করেছেন।
সে হিসেবে ইসলামি আইনে ধর্ষকের শাস্তি নির্ধারণ হবেঃ
১। ধর্ষক বিবাহিত হলে প্রথমে তার উভয় হাত (যে হাতের ব্যবহারে সম্ভ্রম লুটেছে) দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করা হবে, তারপর প্রকাশ্যে জনসম্মুখে মৃত্যদণ্ড কার্যকর করতে হবে।
২। যদি ধর্ষক অবিবাহিত হয়, তবে প্রথমে প্রকাশ্যে ১০০ বেত্রাঘাত করতে হবে, তারপর দুই হাত দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করতে হবে।
এখানে একটি বিষয় বিবেচ্য। হাত বিচ্ছিন্নকরণ শাস্তির কারণ হলো হাতের ব্যবহার। হাতের সাথে লিঙ্গ বিচ্ছিন্নকরণের যোগসূত্র স্থাপন করা যায় কিনা ইসলামি আইনবিদগণের ভেবে দেখার অবকাশ আছে। ইসলামি আইনে সকল শাস্তি প্রকাশ্যে জনসম্মুখে কার্যকর করা হয়। এর প্রধান কারণ হলো, অন্য কারো মধ্যে যেন এমন অপরাধ প্রবণতা না জাগে। ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের হার যেভাবে বাড়ছে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ধর্ষকের শাস্তি প্রকাশ্যে কার্যকর করা উচিত।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণের শাস্তি সম্পর্কে বলা আছেঃ
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ ধারায় ধর্ষণের শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে-
ধারা ৯(১): কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করবেন। এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডও তাকে দেয়া যেতে পারে।
ধারা ৯(২): ধর্ষণের ফলে বা ধর্ষণের পড়ে অন্য কোন কাজের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষণকারী মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করবেন। এছাড়াও তাকে এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
ধারা ৯(৩): একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে এবং ধর্ষণের কারণে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে তাহলে ধর্ষকরা প্রত্যেকেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়াও তাদেরকে অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
ধারা ৯(৪): যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে
(ক) ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন তাহলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
(খ) যদি ধর্ষণের চেষ্টা করেন তাহলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বছর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
ধারা ৯(৫): পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন কোন নারী ধর্ষিত হলে, যাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্ত ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে, সে ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ উক্ত নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরি দায়ী হবেন। এবং তাদের প্রত্যেকে অনধিক দশ বছর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ধর্ষণ মামলায় সাধারণত ধর্ষিতাই একমাত্র সাক্ষী থাকে। বিভিন্ন কারণে ধর্ষণের আলামতও নষ্ট হয়ে যায়। সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্যদানে বিব্রতবোধও করেন। ভরা আদালতে অসংখ্য পুরুষের সামনে বারবার নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলতে অস্বস্তি অনুভব করারই কথা। তার ওপর বিচারক বা বিপক্ষ আইনজীবির বিব্রতকর জিজ্ঞাসা পরিস্থিতির স্বীকার নারীর জন্য আরো বেশি অস্বস্তির কারণ হয়। এই ব্যাপারটি বিবেচনা পূর্বক আইনপ্রণেতাগণ আইনের ধারায় সংশোধনী নিয়ে আসতে পারেন।
আবার নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অপব্যবহারও বেশ লক্ষণীয়। এই আইনের অপপ্রয়োগ করে হয়রানীর ঘটনাও কম নয়। প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হলে আইনের অপপ্রয়োগ রোধের বিকল্প নেই।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ধর্ষণের বিচার ৪৭ বছর পরে তড়িঘড়ি করে সমাপ্ত করা হচ্ছে। সে সময় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, বক্তৃতা, বিবৃতি, ঘটনা শ্রবণকারীদের বক্তব্যকে সাক্ষ্য বিবেচনা করে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এটি দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দক্ষতার প্রমাণ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে কোন ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক সাজার কোন উদাহরণ নেই। কেন? স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার স্বাদ যদি বীভৎস হয় তবে সেই স্বাধীনতা কোন অর্থ বহণ করে বলে মনে হয় না। ৪৭ বছর পূর্বে সংঘটিত ধর্ষণের বিচার কয়েকমাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হচ্ছে। কিন্তু হাজার হাজার নারী শিশুর নির্মম ধর্ষণের বিচার আদালতে থমকে আছে। বিষয়টি চরম দুঃখজনক ও নিন্দনীয়।

একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আমাদের অসুস্থ সমাজব্যবস্থা ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি উত্থাপন না করে ধর্ষিতার দোষ খুঁজে বেড়ায়। এটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রকাশ। কেউ কেউ দাবি করে, ধর্ষণের জন্য পোষাক দায়ি। আবার কেউ দাবি করে ধর্ষণের জন্য পোষাক দায়ি নয়, মানসিকতা দায়ি। একটি বিপর্যয়ের পর এমন দাবি পাল্টা দাবি উচিত নয়। ইসলামে পর্দার বিধান রাখা হয়েছে ধর্ষণ রোধ করার জন্য নয়। পর্দার বিধান শুধু নারীর জন্য নয়, পুরুষের জন্যও প্রযোজ্য এবং যৌক্তিক। ধর্ষণের জন্য পোষাক পুরোপুরি দায়ি না হলেও কিছুটা দায়ি। তবে ৯০% মানসিকতাই দায়ি। যদি পর্দার বিধান অযৌক্তিক হয়, মানসিকতাই যদি সব কিছু নির্ভর করে তবে কাপড় পরারই প্রয়োজন নেই। নারী পুরুষ দিগম্বর হয়ে চলাফেরা করলেই পারে। এতে অর্থনৈতিক লাভও হবে। মূলত ধর্ষণরোধের জন্য পর্দা নয়, বরং ধর্ষণের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে ধর্ষণ রোধের জন্য।
মোটামুটিভাবে নারীর ওপর সীমাহীন নির্যাতনের জন্য যে সকল বিষয়গুলো চিহ্নিত করা যায় তাহলোঃ
১। মানসিকতা।
২। পারিবারির সুশিক্ষার অভাব।
৩। শিক্ষা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত নৈতিক পাঠের অভাব।
৪। নারী ও পুরুষের উগ্র চলাফেরা।
৫। অতীত ধর্ষণ কেসগুলোতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া।
৬। মাদকের ব্যবহার। মদের বারকে লাইসেন্স প্রদান।
৭। বিদেশি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ও আগ্রাসন।
৮। আকাশ সংস্কৃতির অপব্যবহার।
৯। অসৎ সংস্পর্শ।
১০। পর্ণোগ্রাফি, সিনেমায় ধর্ষণ দৃশ্য, অশ্লীল পুস্তক প্রভৃতি।

দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ পূর্বক নারী নির্যাতন রোধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। ঘটে যাওয়া ঘটনায় অভিযুক্ত ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করলে হয়তো এই অমানবিক ঘৃণ্য কাজটি কমে আসতো! রাষ্ট্র যতো দ্রুত বিষয়টি বুঝতে ততো দ্রুত জাতি মুক্তি পাবে।
লেখকঃ প্রধান সমন্বয়ক, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিবার (বাসাসপ)।


No comments